
ফাহিম মালেক (ইভান) ,সহকারী অধ্যাপক, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত আমাদের এই বাংলাদেশ। সকল সম্প্রদায়ের সব মানুষকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে ভিন্ন ভিন্ন উৎসব আমেজের মধ্য দিয়ে মুখরিত হয় প্রতিটি অনুষ্ঠান। “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”— এই বাণীকে মূলমন্ত্র হিসেবে অন্তরে ধারণ করে বাঙালি চেতনায় এক অসাম্প্রদায়িক রূপেরই প্রকাশ ঘটে শারদীয় দুর্গা উৎসব। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হয়েও বাঙালিরূপে সকলেই যেমন একই স্রোতে বহমান, তেমনি একইভাবে, বাঙালি বলেই হয়তো সকল ধর্মীয় রীতিনীতি নিজস্ব সংস্কৃতি রূপেই পরিগণিত হয় আমাদের কাছে। তাই, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উৎসবগুলো বিশেষ কোনও সম্প্রদায়ের না হয়ে, হয়ে ওঠে সকলের। ভিন্ন সম্প্রদায়ের একজন হয়েও আমার মানসপটে শারদীয় দুর্গা উৎসবের প্রতিটি বিষয় তাই জীবনের মধুরতম স্মৃতি হয়ে আজও উজ্জ্বলতার দ্যুতি ছড়ায়।
শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির জয়ে সত্য ও সুন্দরের আরাধনায় সর্বজীবের মঙ্গল সাধনা এই উৎসবের বৈশিষ্ট্য। সত্য সর্বদাই সুন্দর এবং তা সকলের জন্য প্রযোজ্য। তাই সকল সুন্দরের প্রত্যাশায় সকলেই মিলিত হয় সর্বজনীন এই উৎসবে। ধর্মের ভেদাভেদ না বুঝে কিংবা ছেলেবেলার দুরন্তপনায় তা অগ্রাহ্য করেই আনন্দচিত্তে যুক্ত হয়ে যাই উৎসবে। প্রতিমা তৈরী থেকে শুরু করে বিসর্জন অবধি বন্ধুদের সাথে নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ে মাতোয়ারা যেন চারিদিক। জন্মের পর থেকে স্কুলের চৌকাঠে পর্দাপণ অবধি ময়মনসিংহ জেলাতেই কেটেছে দীর্ঘসময়। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এ জেলায় অধিক সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের বাস। তাই ধর্মীয় যে কোনও আয়োজনে জাঁকজমক রূপ ও বিশালত্বের প্রকাশ ঘটে। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুরু শুক্ল তিথিতে ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষকে বলা হয় ‘দেবীপক্ষ’। দেবীপক্ষের শুরুর অমাবস্যা হলো মহালয়া। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়।
বাংলাদেশে প্রথম কবে দুর্গাপূজা শুরু হয়, তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। কারও কারও মতে, পঞ্চদশ শতকে শ্রীহট্টের (বর্তমান সিলেট) রাজা গণেশ প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে কিছু জানা যায় না। তবে বিভিন্ন গবেষকের লেখা থেকে জানা যায়, ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীর তাহেরপুর এলাকার রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন। রাজা কংসনারায়ণ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইঞার এক ভূঁইঞা।
১৯২২-২৩ সালে আরমানিটোলায় জমিদার শ্রীনাথ রায়ের বাড়ির পূজাও বেশ বিখ্যাত ছিল। লালবাগ থানার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজাও বেশ প্রাচীন। উল্লেখ্য, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজিতা দুর্গার আরেক রূপ দেবী ঢাকেশ্বরীর নামেই ঢাকার নামকরণ হয় বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করে থাকেন। ইতিহাসে এই উৎসব সম্পর্কিত এমন হাজারো গল্পের প্রচলন রয়েছে।
দীর্ঘকালের ঐহিত্যবাহী এই উৎসবের শুরু থেকে শেষ অবধি ধর্মীয় কৃত্যমূলক আচার, পূজা-অর্চনা, আরতি কিংবা বিসর্জন সকল ক্ষেত্রেই নিজের উৎসব ভেবেই যুক্ত হয়েছি ছেলেবেলায়। এই উৎসবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আনন্দের অংশটি ছিল আরতি অনুষ্ঠান যেখানে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে একই সাথে হৈ-হুল্লোড়ের সঙ্গে নাচতে দেখেছি। নৃত্যের উদ্দামতায় নেচেছি নিজেও। প্রতিমা বিসর্জনের যে বহর দেখা যেত তখন, সেখানে তাদের সঙ্গী হয়ে একাকার হয়ে গেছি। এক অভূতপূর্ব আনন্দের স্রোতে সকলেই যেন একত্রে ভাসিয়েছি তরী। ময়মনসিংহ শহরের সর্বাপেক্ষা বড় পূজামণ্ডপ তৈরী হতো বড় দুর্গাবাড়ি মন্দিরে। উৎসবকে কেন্দ্র করে মন্দিরপ্রাঙ্গণ ও তার আশেপাশের ছোট-বড় দোকানে নানাকিছুর পসরা সাজিয়ে মেলা বসতো। এই মেলা ছিল আমাদের কাছে ভিন্ন একটি আকর্ষণ। খেলনাসামগ্রী থেকে শুরু করে হরেকরকম মুখরোচক খাবারে আনন্দের যেন সীমা থাকতো না। বন্ধুদের যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলো তাদের বাড়ি গিয়ে মাসীর হাতে নাড়ু, লাড্ডু, সন্দেশ থেকে শুরু করে নানা পদের খাবার খেয়েছি। নতুন জামা নেওয়ার প্রচলন তাদের জন্য প্রযোজ্য থাকলেও বায়না বা আবদারের প্রচণ্ড তাড়নায় বাবা-মায়েরা আমাদেরও তা দিতে বাধ্য হতেন। শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন। তৎকালীন সময়ে গান, নাচ থেকে শুরু করে নাটকের আয়োজনও করা হতো যা সকলের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। সেই ঐহিত্যের ধারাবাহিকতা এখনও বজায় রেখে স্থানীয় পূজা পরিচালনা কমিটি তাদের নিজ নিজ আয়োজনের সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন মণ্ডপে এর ব্যাপকতা দেখা যায়। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এক অসাধারণ শৈশব কেটেছে ময়মনসিংহে যা স্মৃতির উজ্জ্বল আলোয় এখনও রঙিন মনে হয়। তবে, জীবনের প্রথম পূজামণ্ডপে যাবার যে স্মৃতি তা আমার মায়ের সাথে। দেবীদর্শনের পাশাপাশি দেবী দুর্গার পরিচিতি, অসুর, গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী কিংবা সরস্বতী সম্পর্কে প্রথম ধারণা মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিটা সেই ছেলেবেলা থেকে মা গড়েই দিয়েছিলেন আমাদের। তারই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমিও আমার কন্যাকে একই শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছি। এখনও বিভিন্ন পূজাপার্বণে মেয়েকে সাথে নিয়ে বিশেষ আয়োজনে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো নিয়মিত একটি কাজ। আমার কন্যাও তা উপভোগ করে আনন্দ নিয়ে।
মায়ের চাকরির বদলির সুবাদে ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর জেলায় রচিত হয় আমাদের নতুন অধ্যায়। নতুন স্থান, নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন মানুষের ভিন্ন সংস্পর্শ হলেও দুর্গোৎসবের সেই আমেজ যেন একই থাকে। নতুন বন্ধুদের সাথে নতুন আয়োজনে ভিন্নভাবে পালিত হয় উৎসব। আধুনিককালের প্রযুক্তিগত বিকাশে মণ্ডপভেদে আধুনিকতার নানাবিধ ছোঁয়া বা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। আধুনিক আলোর ঝলকানি, সঙ্গীতের ব্যবহার দিন-দিন আমাদের আকর্ষণকে প্রতিনিয়ত বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজনও থাকে। পূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের রাঙিয়ে তোলে নতুন সাজে। বিগত কয়েকদশক ধরে বাংলাদেশের পূজাগুলোয় সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ বেশ চোখে পড়ার মতো, একারণে বাংলাদেশে প্রতি বছরই পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, সারা বাংলাদেশে প্রায় ত্রিশ হাজারেরও বেশি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছে।
পূজার নিজস্ব ঐতিহ্যের সাথে নানাবিধ বিষয়ের আয়োজন ছিল। কোথাও এক হাজার দুই হাত রয়েছে দেবী দুর্গার, কোথাও বা শুধুই হাজার। থিমের উপর ভিত্তি করে পূজায় কোথাও স্থান করে নিয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা বর্তমান সময়ের সামাজিক অবস্থার চিত্র। সমাজের সকল অন্যায় আর অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলকামনায় এই উৎসব যেন সকল ধর্মের মানুষের কাছে আকাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত এক আয়োজন। সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ ভুলে শারদীয় দুর্গোৎসব তাই সর্বজনীন। সকল সৃষ্টির মঙ্গলকামনায় এই আয়োজন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এই উৎসব হয়ে ওঠে সকল সম্প্রদায়ের উৎসব, সমগ্র জাতির উৎসব। একটি সুন্দর সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনে সকল শ্রেণীর মানুষকে একত্রিত করতে এইধরনের উৎসবের ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য।
তথ্যসূত্র :
১. বাংলার দুর্গাপূজা ও তার ইতিহাস – দেবলীনা দত্ত
২. আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্ম-বিশ্বাস, ধর্ম-চর্চার ধরন
৩. বাংলাদেশের শারদীয় দুর্গাপূজার ইতিবৃত্ত – পাপিয়া দেবী
৪. উইকিপিডিয়া