সেই সাত দিন

দেবদূত ঘোষঠাকুর

আগে বারোয়ারি কিংবা বাড়ির প্রতিমার মুখ খোলা হত ষষ্ঠীর দিনে। কিন্তু এখন তো মহালয়ার আগেই শুনেছি প্রতিমার মুখের আবরণ খুলে দেওয়া হয়। ষষ্ঠী পর্যন্ত অপেক্ষা করে না কোনও বারোয়ারি পুজো কমিটি। চতুর্থীর মধ্যে সবার উদ্বোধন শেষ। এটাই এখন দস্তুর।
পুজোআর্চা তো শাস্ত্রীয় মতে শুরু ষষ্ঠী থেকে। তাহলে মহালয়া থেকে ষষ্ঠী, এই সাতদিন, কিংবা চতুর্থী, পঞ্চমী ছেলমেয়েদের নিয়ে মন্ডপে কি করেন মা দুগ্গা? পুজো হয় না,তাই প্রসাদও নেই‌। তাহলে কি উপোস করে থাকেন দুর্গতিনাশিনী? সন্তানদের জন্য কষ্ট পান না? প্রশ্নটা কিন্তু আমার নয়। পাশের বাড়ির এক খুদে অভীর।
ছোট্ট অভির এই প্রশ্নটা কিন্তু ফেলে দেওয়ার নয়। সবাই অবোধ বালকের কথা বলে প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলেও, আমার মনে হল‌ এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও গল্প আছে। সুতরাং ছুটলাম পন্ডিতের কাছে। বারোয়ারি পুজোগুলি কি করে তা তাঁদের জানা নেই। তবে বেশ কয়েকটি বাড়ির পুজোয় যে মহালয়ার পরদিন‌ অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে পুজোর প্রচলন আছে সেটা পরিষ্কার হল। মা সেখানে পুজো পান। প্রসাদ থাকে। ছেলেমেয়েকে বাহিনসহ আর অভুক্ত থাকতে হয় না।
যেমন ধরুন হুগলির তারকেশ্বরের তুল্যান রায় বাড়ির পুজো। সেই পুজোয় প্রতিপদ থেকে কল্পারম্ভ শুরু হয়। ওই দিন থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত প্রতিদিন ১০০৮ বার মধুসূদন নাম, ১০০৮ বার শ্রীদুর্গা নাম করা হয়। ১০০০টি তুলসি পাতা দেওয়া হয় নারায়ণকে। গঙ্গামাটি দিয়ে তৈরি দ্বাদশ শিবলিঙ্গ পুজো করা হয়। ন’বার চণ্ডীপাঠ করা হয়।
বেহালার হালদারবাড়ির পুজো বৃহৎ নন্দীকেশ্বর পুরাণ মেনে, বৈষ্ণব মতে করা হয়। রথের দিন কাঠামো পুজো করে তাকে নতুন শাড়ি পরিয়ে রাখা হয়। পূজা-দালানে প্রথম পুজোর এই কাঠামোতেই গড়া হয় দেবীমূর্তি। ডাকের সাজের মাতৃমূর্তি এই পরিবারের পুজোর বৈশিষ্ট্য। মহালয়ার দিন থেকে যে দেবীপক্ষের সূচনা হয়, নবরাত্রি পালনে তা শেষ হয় দশমীতে। মহালয়ার পর দিন বা প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী অবধি রোজই হয় চণ্ডীপাঠ।
কলুটোলার ধর বাড়িতে মা দুর্গার মূর্তিটি মা অভয়ার। প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী অবধি ঘট পুজো করা হয়। পরিবারের নিয়মানুযায়ী প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত, প্রতিদিন ‘পাঁচ কলাই’ আলাদা করে তুলে রাখা হয়। পুজো শেষে পরিবারের সবাই সেই পাঁচ কলাই সেদ্ধ খান।
মধ্য কলকাতার শীল লেনের দাস বাড়িতে পুজো শুরু হয় ১৬ দিন আগে কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে। মহালয়া পর্যন্ত পৌরাণিক নিয়মে পুজো হয়। ফের প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী বিশেষ পুজোর পর সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত হয় মহাপুজো।
উদাহরণ আরও আছে।
হাওড়ার সাঁকরাইলের রাজগঞ্জে পালবাড়ির দুর্গাপুজো হয় সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে। জন্মাষ্টমীতে কাঠামো পুজো হয়। মহালয়া থেকে শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। এই বাড়ির একচালার দুর্গা প্রতিমা বাড়ির ঠাকুরদালানেই তৈরি হয়। অষ্টমীতে তৈরি হয় বিশেষ ভোগ। এ বাড়িতে সিঁদুর খেলা দশমীতে নয়, হয় অষ্টমীর দিন। দশমীর দিন দেবীকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়ার রীতি।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মহালয়ার দিন থেকেই সকলের মঙ্গলকামনায় যজ্ঞ শুরু করেন। , টানা নবমী পর্যন্ত চলত সেই যজ্ঞ৷ কথিত আছে, মহালয়ার পর থেকে নাকি কখনও আগুন নিভত না যজ্ঞের৷ দেবী এখানে রাজরাজশ্বরী, শক্তির প্রতীক।
পন্ডিতদের বিধান, যে ভাবে বড় বারোয়ারি পুজোগুলি মোটামুটি মহালয়ার পর থেকেই দর্শনার্থীদের জন্য প্রস্তুতহয়ে যাচ্ছে, তাতে ওই সব পুজোয় পুজোর বিধান পরিমার্জনের প্রয়োজন। মা মন্ডপে মুখের আবরণ উন্মুক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকবেন, অথচ তিনি পূজিত হবেননা, এমন ঘটনায় দেবী তুষ্ট হতে পারেন। বড় বারোয়ারির উদ্যোক্তারা শুনছেন কি?
কিছু বাড়ির পুজো কি করে সেটা জানাতেই এই প্রতিবেদন। এর মধ্যেই সঙ্কটমোচনের পথ কিন্তু খুঁজে নিতে পারেন। কিংবা খোঁজ নিতে পারেন কাশী বোস লেন দুর্গা পুজো কমিটির উদ্যোক্তাদের কারও সঙ্গে। এই মন্ডপে বহু বছর ধরেই কিন্তু প্রতিপদ থেকেই নিত্য পুজো হয়।

Share