
দেবদূত ঘোষঠাকুর
মা দুর্গার সঙ্গে অসুরের লড়াইয়ের সময়ে তাঁর চার ছেলেমেয়েদের ভূমিকা কি ছিল তার যথাযথ ব্যাখা কোথাও নেই। মায়ের সঙ্গে মর্তে আসছিলেন সবাই। মাঝপথে যুদ্ধ। ছেলেমেরা তাদের বাহন সহ গেলেন কোথায়? বড় ছেলে কার্তিকেয় দেব সেনাপতি। তাঁকেও বা যুদ্ধে দেখা গেল না কেন? নাকি যুদ্ধটুদ্ধ শেষ করে তারপরেই মা দুর্গা বাপের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন? এসব প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা নেই।
প্রশ্ন তো আরও আছে। দেবীরা নিজেরাই এক একজন শক্তির আধার। তাহলে আবার বাহনের দরকার কেন?
মা দুর্গার বাহন সিংহ। মা দুর্গার বাহন হিসেবে সিংহকে মানায়। দুজনেই শক্তির প্রতীক। শৌর্যের প্রতীক। অসুরের সঙ্গে যুদ্ধে সিংহের অবশ্য একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। আধুনিক কর্পোরেটের ভাষায় সিংহ মাল্টিটাস্কার। সে মা দুর্গাকে পিঠে চাপিয়ে যেখানে সেখানে নিয়ে যেতে পারে। বিশাল হুঙ্কার ছেড়ে, কেশর ফুলিয়ে বিপক্ষের বুকে ভয় ধরিয়ে দিতে পারে। আবার তীক্ষ্ণ দাঁত আর ক্ষুরধার নখে শত্রুকে ক্ষবিক্ষত করে ফেলতে পারে। এটাই একশ।
সিংহ কিন্তু মা দুর্গার কাছে যেচে আসেনি। মা দুর্গার সমর সজ্জার অঙ্গ হিসেবে ভেট দিয়েছিলেন হিমালয় পর্বত। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মা দুর্গাকে নানা অস্ত্রে সাজিয়ে দিয়েছিলেন দেবতারা। আর হিমালয় অস্ত্র হিসেবে সিংহ উপহার দিয়েছিলেন দেবীকে। হিমালয় ম দুর্গার বাপের বাড়ি। শ্বশুর বাড়িও বটে। দুই বাড়ির তরফে এমন একটা উপহার দুর্গাকে দেওয়া হয়েছিল, যে রাবার এক গাঁয়ে মহিষের পেট ফাটিয়ে তার মধ্য থেকে মহিষাসুরকে বের করে এনেছিল। যথার্থ বাহন কিংবা সেবক আর কি?
কন্দর্পকান্তি কার্তিক ময়ূরের পিঠে চেপে ঘুড়ে বেড়ান। ময়ূর কার্তিকের বাহন হওয়াটা তবু মানায়। ময়ূর পাখিদের মধ্যে সব থেকে সুন্দর। কার্তিকের পাশে থাকার যোগ্যতম। আবার ময়ূর শিকারি পাখি। তার নখ আর ঠোঁটকে ভয় পায় চতুষ্পদেরাও। ময়ূরের ঘুম কম। গাছের ডালে বসে তীক্ষ্ম নজর রাখে চারিদিকে। সেনাপতির সহযোগী হওয়ার যোগ্য। তবে কার্তিক কখনও যুদ্ধ করেছেন এমন অভিযোগ কেউ কখনও করেনি।
কার্তিক এবং ময়ূর নিয়ে উত্তর ভারতে একটি গল্প প্রচলিত আছে। সেটা ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ। উত্তর ভারতের হরিয়ানায় যৌধেয় বলে একটি জনজাতির বাস ছিল। তারা ছিল যুদ্ধবাজ জাতি। উত্তর পূর্বের জ্ঞাতিদের দেবতা ছিলেন শিব। কোনও কোনও কোনও জনজাতি নিজেদের শিবসঙ্গী নন্দীর বংশধর বলে মনে করেন। যৌধেয়রা ছিলেন কার্তিকের উপাসক। তাঁদের গোষ্ঠীর প্রতীক ছিল ময়ূর। ময়ূর কার্তিকের বাহন হওয়ার গল্পটা এখানেই।
পড়ে রইল ইঁদুর, পেঁচা এবং হাঁস। রাজহাঁস। এরা গণেশ, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর বাহন।
প্রথমে দেখা যাক ইঁদুর কীভাবে এবং কেনইবা গণেশের বাহন হল। পুরাণের গল্পে আছে ইন্দ্রের রাজসভায় এক সুদর্শন গায়ক ছিলেন। নাম তাঁর ক্রৌঞ্চ। নিজের রূপ আর সঙ্গীত নিয়ে খুব দম্ভ ছিল ওই গায়কের। ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। ইন্দ্রের রাজসভায় ঋষি বামদের এলেন। আপ্যায়নে প্রীত হয়ে আনন্দে গান গেয়ে উঠলেন। যদিও তাঁর গলায় সুর ছিল না। ক্রৌঞ্চ নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। বেসুরো গান গাওয়ায় বিদ্রুপ করে বসলেন ঋষিকে। বামদের ক্রুদ্ধ হলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে অভিশাপ। বামদের ক্রৌঞ্চকে বললেন, ‘যে সৌন্দর্য ও গুণের জন্য তোর এত অহঙ্কার, সে সব কিছুই থাকবে না।’ ক্রৌঞ্চ হয়ে গেলেন এক ছোট্ট কদাকার ইঁদুর। স্বর্গে আর তাঁর ঠাঁই হল না।
পৃথিবীতে এসে ঋষি পরাশরের আশ্রমে আশ্রয় নিলেন ইঁদুররূপী ক্রৌঞ্চ। সেখানেই একদিন তাঁর দেখা হল গণেশের সঙ্গে। সব শুনে গনেশ তাঁকে পায়ে ঠাঁই দিলেন। কিন্তু এর ব্যাখ্যাটা কি? বিশালকায় গণেশের সামনে ক্ষুদ্র ইঁদুর থাকা মানের নিজের অহঙ্কার, ক্রোধ ও অনান্য তামসিক গুণকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাই কি? পন্ডিতেরাই আসল ব্যাখ্যাটা না হয় দিন!
দেখতে কেউ খারাপ হলে তাকে আমরা বিদ্রূপ করে বলি, ‘প্যাঁচার মতো দেখতে।’ কিন্তু অপরূপ সুন্দরী, সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর কৃপায় ঘরে ঘরে পেঁচাও পূজিত হয়। কিন্তু লক্ষ্মী ঠাকুর তা বলে পেঁচা ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পেলেন না? এর ব্যাখাটা কোথাও শুনিনি। তবে পড়েছি, রূপ নয়, পেঁচার গুণটাই এখানে লক্ষ্যণীয়। পেঁচা একটি প্রতীক মাত্র। কীসের প্রতীক? লক্ষ্মীর অসীম ঐশ্বর্যের দিকে তার কোনও লক্ষ্য নেই। সে আসলে উদাসীন। জাগতিক সমস্ত চাওয়াপাওয়া থেকে সে নিজেকে সরিয়ে রাখে দূরে। অনেকটা শ্রী রামকৃষ্ণের ‘টাকা মাটি মাটি টাকার’ নির্লিপ্ততার মতো।
দুধ আর জল মিশিয়ে দিলে রাজহাঁস শুধু দুধটুকু ঠোঁট দিয়ে টেনে নেয়। সংসারে যোগীন মাকে এই ভাবেই থাকতে বলেছিলেন রামকৃষ্ণদেব। অর্থাৎ অকিঞ্চিৎকর বিষয় ত্যাগ করে পরমার্থ জ্ঞান লাভ করাই সংসারী মানুষদের লক্ষ্য। ঠিক রাজহাঁসের মতো। তবে পুরাণে আছে, ব্রহ্মা সরস্বতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করতে উদ্যত হন। ভীত দেবী একটি হাঁসের রূপ ধারণ করেন। পরে সেটাই বাহনে রূপান্তরিত হয়েছে বলে অনুমান। কিন্তু ব্রহ্মার বিরুদ্ধে সরস্বতী তাঁর বাবা মায়ের কাছে কিংবা দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন কী না জানিনা। হয়তো ব্রহ্মাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাই ছিল না কারও।
(কিছু শোনা গল্প, কিছু পড়ে লেখা, আর কিছুটা কল্পনা মিশিয়ে আমার এই প্রতিবেদন। দেবদেবী আর তাঁদের ভক্তেরা রুষ্ট হবেন না প্লিজ! নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন কিন্তু।)